জাতীয়সিরাজগঞ্জ

চাঁপাইয়ে আমের বাজারে ধ্বস: মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মালিকেরা

আমের মৌসুমে আম্রকানন নিধন হচ্ছে; বিকল্প পথে হাটছে কৃষক     

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ফিরে সৈয়দ শামীম শিরাজী: আমের রাজধানী নামে খ্যাত বা পরিচিত রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ এলাকায় এখন আমের বাগান নিধন হচ্ছে। আমের বাজারে ধ্বস, প্রাকৃতিক দূর্যোগ,বৈরী আবহাওয়া, হাইব্রীডের ছোট ছোট গাছের উৎপাদন, আম গবেষনা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েও তা আতুর ঘরে চলে যাওয়া, প্যাকেজিং হাউজ নির্মানের দাবিকে গুরুত্ব না দেওয়া, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো কোয়ারেনটাইন ও কৃষি সম্প্রসারন বিভাগে সমন্বয়নের অভাব, বিশেষত আম পরিক্ষার জন্য কোয়ারেনটাইনে পাঠানোর পরে ফলাফলে বিলন্বনা ঘটা, বাংলাদেশে ভারতীয় আম আসা, দিনাজপুরে আম আগে বাজারজাত করাসহ নানাবিধ কারনে এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের বাজারে মূল্য না থাকায় মালিক পক্ষ আম বাগানের গাছ কেটে ফেলে ঐসব বাগানে আখ, সব্জি, গোখাদ্য, ভুট্টা, গম আবাদের ঝুকে পড়েছে। এতে ভাল লাভ হওয়ায় আম বাগানের মালিক পক্ষ এই বিকল্প পথে হাটতে বাধ্য হচ্ছে বলে জানা গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের রানীহাটি, শিবগঞ্জ ও কানসাটে সব মিলগুলোতে এখন আমকাঠ চেরায়েও ধুম পড়েছে। বিশাল স্তুপাকারে রাখা আমকাঠ এর উজ্জল দৃষ্টান্ত বহন করছে। এতে করে চেরাই করা আম কাঠের মূল্যহ্রাস পেয়েছে বলেও জানান, ‘স’মিল মালিক ও কাঠ ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, লাগাতার ভাবে তিন চার বছর রাজশাহীর খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগান মালিকেরা আমের দাম তুলুনামূলকভাবে কম পাওয়ায় বিপাকে পড়ে। এক বছর প্রচন্ড শিলা বৃষ্টিতে আম পাতাসহ মুকুল ঝড়ে পড়ে। এরপর  করোনাকালীন সময়ে আম বাজারজাত করতে না পেরে মার খায়। সর্বপরি প্রতিবছর দিনাজপুরের আম রুপালি, দিপালিসহ নানা জাতের মিষ্টি সুস্বাদু আম সবার আগে বাজার পেলে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করার পর শেষদিকে আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম। এতে বাজার না পেয়ে তারা হতাশ হয়ে পড়ে। ফলে এখন এই সব কৃষকেরা আম গাছ কেটে ফেলে সেই জমিতে উল্লেখিত চাষাবাদ শুরু করেছে। ফলে এই সকল আম বাগান নির্বিচারে নিধন হচ্ছে। বাগান মালিকদের মতে বর্তমানে একবিঘা জমির আম বাগান থেকে দশ হাজার টাকা জুটেনা। ফলে দিন দিন তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সংসারে অচলাবস্থা ও ঋণে জড়িয়ে পড়ায় বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে।

অনেকে একবিঘা জমিতে আখ আবাদ করে বিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা লাভ করছে। কেউ আবার সব্জি আবাদ করে দ্বিগুন লাভের মুখ দেখছে। সেই সাথে কেউ কেউ গোখাদ্য ঘাস আবাদ করেও উচ্চ মূল্য পাচ্ছে। ফলে এখন বাগান মালিকরা ঐদিকে ঝুকে পড়ছে। তাই রাজশাহী অঞ্চলে আম বাগান এখন হুমখির মুখে বা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হচ্ছে। এ ব্যাপারে রানিহাটির সাবেক প্রথম আলোর সংবাদদাতা জাহিদুল আনাম জানান, প্রতি বছর ঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে আমের আবাদ শুন্যের কোঠায় পৌছে, দ্বিতীয়বার পড়তে হয় করোনার মধ্যে, তৃতীয় দফায় যে আম পাওয়া যায় তাতে লাভের মুৃখ দেখা হয়না। এভাবে ফিবছর লোকশান গুনতে গুনতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে আম বাগানের মালিক পক্ষ বিকল্প পথের চিন্তা ভাবনা করে অনান্য ফসল আবাদ করছে।

অপরদিকে তসলিম উদ্দিন শিক্ষক জানায়, তিনি একবিঘা আম বাগান বাইস হাজার টাকা লিজ দিয়েছে। কেউ কেউ আবার পচিশ হাজার টাকাও পাচ্ছে। এসব দেখাদেখি অনেকে আম বাগানে আমের চাষ করা থেকে সরে আসছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক সচেতন যুবক জানায়, কীটনাশক সারসহ অনান্য সরঞ্জামের অগ্নিমুল্য, এর উপর শ্রমিকের মুজুরি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, আম বাগানের পাহাদারের ব্যবস্থা, আম পাড়া ও বাজারজাত করন করা দু:সহ যন্ত্রনা ও খরচ বৃদ্ধির ঝামেলা রয়েছে। তাই এ থেকে মুক্তি পেতে সবাই অন্য আবাদে ঝুকে পড়ছে এবং লাভবান হচ্ছে। আম বাগান নিধন করে একটি শ্যালো মেশিন দিয়ে সারা বছর সব্জি চাষ, আখ চাষ ও নিপিরিয়ান ঘাস বিক্রি করছে অধিকাংশ কৃষক। আবার গম ও ভুট্টা আবাদ করে তাতে ফল ধরার পূর্বে ঘাস হিসেবে বিক্রি করে গোখাদ্য হিসাবে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে লাভবান হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশী মাত্রায় মুনাফা পাচ্ছে কৃষকেরা। তাই তারা শত বছরের পুরানো আম গাছ কেটে ফেলতেও দ্বিধা-সংকোচ করছে না। এদিকে আম বাগান কেটে জ্বালানি ও খড়ি হিসাবে বিক্রি করে, কেউ আবার চেরাই করে কাঠ বিক্রি করছে। এই অঞ্চলে ‘স’মিলের দিকে তাকালে তা সহজেই দেখা যায় ব্যস্ত সময় পার করছে ‘স’মিল মালিকেরা। তারা আম কাঠ চেরাই করে লাভবান হচ্ছে।

যদিও চলতি বছর আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এবছর আম গাছগুলোতে গুটিতে গুটিতে ভরে গেছে। কৃষি বিভাগ বলছে, এবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম বাগানে প্রায় একশোভাগ মুকলিত হয়েছে। হমোন স্প্রে করা গাছে ও পরিচর্চা বাগানে যেমন মুকুল ধরেছে তেমনি স্প্রেহিন ও পরিচর্যাহীন বাগানে একই সমান মুকুল ধরেছে। তাদের মতে আমের জন্য এটি একটি ব্যতিক্রমি বছর বলা যায়। তারপরে গুটি ধরা আম গাছ কর্তন করা হচ্ছে নির্বিচারে। তাদের আত্মবিশ^াস নেই যে ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে আম পাওয়া যাবে কিনা ? তাই তারা আর কোনভাবে ভরসা পাচ্ছেনা। আম বাগানে লাভবান হওয়া গুড়ে তাই পড়েছে বালি। বংশ পরম্পরায় ১০/১২ বিঘা জমি আম বাগান মালিকের সুপুত্র শিক্ষক শিপার জানান, এবার আমারাও ভাবছি ১০/১২ বিঘা জমিতে বিকল্প আবাদ করবো অথবা লিজ দিবো। কেননা প্রতি বছর ১০/১২ বিঘা জমিতে একলাখ টাকাও আমে আয় হয়না। অথচ অন্য আবাদে জমি লিজ দিলেও কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই লাখটাকা পাওয়া যাবে। নিজেরা আবাদ করতে পারলে আরো বেশি অর্থ পাওয়া যাবে। সুতরাং আমের মত ঝুকিপূর্ন আবাদ কেন করতে যাব ?

উল্লেখ্য, কৃষি বিভাগের মতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৮ শত হেক্টর জমিতে প্রায় ৫/৬ লাখ টন আম উৎপাদন হয়। অপরদিকে কৃষকদের মতে ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে আম উৎপাদন হয়ে থাকে প্রায় ১২ লাখ ৬০ হাজার টন। এতে করে কৃষি বিভাগের তথ্যের পার্থক্যে বোঝা যায় কৃষি বিভাগের অনীহার তথ্যটি। ত্রিশ বছর পূর্বে শুধুমাত্র আমের মান ও জাতের উন্নয়নের জন্য আম গবেষণার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলেও কয়েক বছরের মধ্যে এটা নাকি আতুর ঘরে চলে যায় বলে অভিযোগ মালিক পক্ষের। তাদের মতে প্যাকেজিং হাউজ নির্মানের দাবি যেমন গুরুত্ব পায়নি তেমনি রপ্তানির সাথে জড়িত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো কোয়ারেনটাইন ও কৃষি সম্প্রসারন গবেষণা বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের তীব্র অভাব পরিলক্ষিত হয়। তাদের মতে আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে ওঠা জরুরি প্রয়োজন। সেই সাথে বেকার যুবকেরা প্রশিক্ষন পেলে তারা নিজ অর্থায়নে বাড়ি বাড়ি আমচুর, আমতা, আচার, জেলিসহ বিভিন্ন আমজাত পন্য উৎপাদন করে সাবলম্বী হতে পারে। এতে করে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হলে ৪০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে মালিক পক্ষের ধারনা। অথচ এদিকে কৃষি বিভাগের নজরদারী নাই বলে অভিযোগ রয়েছে। এতকিছুর পরেও চাপাইনবাবগঞ্জের আম চাষীদের জন্য সুসংবাদ ও আনন্দের খবর হচ্ছে, ইতিমধ্যে জেলার ৪ টি আম জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রায় ৪ বছর আগে এ ছিল খিরসাপাত আমের। এরপর ফজলি আমের স্বীকৃতি রাজশাহী জেলা কোনভাবে আদায় করলেও চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে মামলা করে ফজলি আমের স্বীকৃতি ছিনিয়ে আনে। আর অতি সম্প্রতি লেংড়া ও আশি^না আমের জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে আবেদন করার তিন বছর পরে। স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই আমের মান আরও উন্নত করা যায় সে ব্যাপারে গবেষণা জরুরি। এবং একই সাথে জাতগুলোর রপ্তানির ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের ভূমিকা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

এখানে উল্লেখ্য, রপ্তানির সাথে যুক্ত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো কোয়ারেন্টাইন, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, গবেষণা বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের তীব্র অভাব লক্ষ করা যায়। ফলে হয়রানী হচ্ছে রপ্তানিকারকেরা। যে কারনে বিশ্ব বাজারে আম রপ্তানি হচ্ছে না। যেটুকু হয় তা ব্যক্তি পর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমে। সেখানেও প্রতিবন্ধকতার শেষ নেই। বিশেষত আম পরীক্ষার জন্য কোয়ারেন্টিনে পাঠালে তার ফলাফল যথা সময়ে আসে না। ফলে তখন আম রপ্তানিযোগ্য থাকে না। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় রপ্তানিকারকেরা।

রপ্তানিকারকেরা এ ব্যাপারে গত ১০ বছর ধরে সবমহলেই দিনদরবার করে আসছে। কিন্তু যেমন স্থানীয় জণপ্রতিনিধিদের পৃষ্টপোষকতা পায় না তেমনি সরকারি কর্মকর্তারাও সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসে না। ফলে রপ্তানিযোগ্য আমের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে উঠছে না। এতে করে রপ্তানি থেকে যে রাজস্ব পাওয়ার কথা সেটা যেমন সরকার পাচ্ছে না, তেমনি রপ্তানিকারকে বাধ্য হয়ে রপ্তানিযোগ্য আম দেশিয় বাজারে অর্ধেক দামে বিক্রী করে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এমনকি অনেক আম পচে নষ্ট হয়ে যায়। মার্কেটিং বিভাগ আমের বাজার খোঁজার জন্য কাজ করছে না বলে অভিযোগ কৃষি বিভাগের। রপ্তানিযোগ্য আম প্রকল্প হবার কথা শোনা যাচ্ছে কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না। সারাদেশের জন্য এক ও অভিন্ন আম নীতিমালা হবে বলেও শোনা গেলেও তার কোন হুদিস পাওয়া যায় না। আম সংরক্ষন ও প্রক্রিয়াজাতকরন শিল্প আজও এখানে গড়ে উঠেনি। এব্যাপারে সভা সেমিনারে বড় বড় পরামর্শ শোনা যায় কিন্তু তা বাস্তবায়নে যে সুবিধা দেওয়া দেয়া দরকার বিশেষত প্রশিক্ষনের কোন ব্যবস্থা নেই।  বেসরকারি পর্যায়ে বড় আকারে আম নিয়ে যে শিল্প রয়েছে সেখানে আমের পাল্প ও জুস ছাড়া অন্য কোন কিছু উৎপাদন হয় না। তবে আম থেকে যে পণ্যগুলো উৎপাদিত হবে তা যেন সহজে রপ্তানি করা যায় সেদিকেও সরকারির লক্ষ রাখা উচিত বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কৃষি সম্প্রসারন বিভাগের পরিচালক পলাশ সরকারকে (০১৭১১-২৭৮৭৫২) ও উপজেলা কৃষি অফিসার কানিজ ফাতেমাকে (০১৭১৯-৪০২৮৪৮) বেশ কয়েকবার মুঠোফোনে ফোন দিয়েও তা রিসিভ না হওয়ায় এ ব্যপারে তাদের মন্তব্য তুলে ধরা গেল না।

ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল মনে করে এভাবে চলতে থাকলে এক সময় রাজশাহীর আমবাগান নিঃশেষ হয়ে যাবে। এ অঞ্চল আমের ঐতিহ্য হারাবে। তাই সময় থাকতে উচ্চ পর্যায়ে উর্দ্ধতন কৃর্তপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন সচেতনমহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button