
চৌহালী থেকে ফিরে সৈয়দ শামীম শিরাজী: `নদীর এ কুল ভাঙ্গে ও কুল গড়ে এইতো নদীর খেলা, সকাল বেলার ধনীরে তুই ফকির সন্ধ্যা বেলা’। বিখ্যাত এই গানের কথা আজ সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলাবাসীর জীবনে বাস্তব রুপ লাভ করেছে। তিন যুগ ধরে যমুনা নদীর ভাঙ্গনে নিঃস্ব চৌহালী উপজেলার মানুষ।
ধারাবাহিকভাবে অব্যহত নদীর তীব্র ভাঙ্গনে রাক্ষুসে যমুনা এলাকাবাসীকে করেছে রিক্ত, নিঃস্ব, সর্বশান্ত। এতে কেউ হারিয়েছে বসতভিটা, কেউ হয়েছে পথের ফকির, আবার কেউ হারিয়েছে ন্যায্য ভোটাধিকার। প্রমত্তা যমুনা তার হিংস্র থাবায় বাড়ির ঠিকানা কেড়ে নেয়ায় তারা হয়েছে এমনতর দুরাবস্থার শিকার। তাই তাদের প্রচন্ড ক্ষোভ ও অভিযোগ- আমাদের দুঃখ, দুর্দশা, জ্বালা, যন্ত্রণা ও সমস্যা দেখার যেন কেউ নেই। বলা বাহুল্য, চৌহালী উপজেলা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে এখন শুধু মানচিত্র থেকেই নয় সিরাজগঞ্জ জেলা থেকে সরে গিয়ে টাংগাইল জেলার শেষ সীমান্তে মিলিত হয়েছে। অপর দিকে উত্তর প্রান্তের কাজীপুর উপজেলাও তীব্র ভাঙ্গনের কারণে মিলিত হয়েছে জামালপুর জেলার সাথে। এভাবেই চলছে সিরাজগঞ্জ জেলার নদী তীরবর্তী ৫ টি উপজেলার নদীপারের ভাঙন।
যমুনা বিধৌত ঐতিহ্যবাহী সিরাজগঞ্জ জেলাটি নদী বেষ্ঠিত। এ জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ৫টি উপজেলা নদী তীরে অবস্থিত। সিরাজগঞ্জ সদর, কাজীপুর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর। এর মধ্যে তীব্র্র ভাঙ্গনের কবলে কাজীপুর, শাহজাদপুর, চৌহালী। দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে চৌহালী ভাঙ্গছে। ২০১০ সালে ভাঙ্গন তীব্র পর মাঝ পথে স্থীর থাকলেও যমুনার রাক্ষসী থাবা পড়ে ২০২০, ২১, ২২ ও ২০২৩ সালে। বর্তমান পাহাড় সমান ভাঙ্গনের দৃশ্যপট। সিরাজগঞ্জ শহর থেকে কড্ডার মোড় হয়ে টাংগাইল সদর তারপর যেতে হয় নাগরপুর উপজেলা সদরে। সেখান থেকে অটোরিকশা যোগে গয়হাটা এরপর সেই দূর্গম বিনানই গ্রামের ভাঙ্গন এলাকা। প্রায় শত মাইল পথ পেরিয়ে ঠিকানা মিললো সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী। শুষ্ক মৌসু্মে এমনই অবস্থা চৌহালীবাসীর। এর একটি অংশ যমুনা নদীর পশ্চিম তীর সংলগ্ন বেলকুচির পার্শবর্তী এনায়েতপুর। এনায়েতপুর থেকে উপজেলা সদরে যেতে পারি দিতে হয় উত্তাল নদী পথ। দুর্গম চরাঞ্চলের দুর্গম রাস্তার দৃশ্য এখনও বর্তমান। গোড়ালির সমান ধুলোর পথ আর এক হাটু পরিমান গর্ত-এই চরাঞ্চরের রাস্তা বিশ্বাসই করা যায় না। তবুও ধুলো-বালি ঠেলে আসতে হয় চৌহালীতে।
এত কষ্ট আর ঝুকি নিয়ে ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত উপজেলার ১০৬ নং বিনানই পশ্চিম পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা মিলল ৬৯ বছর বয়সী মো. আব্দুল মতিনের সাথে। এরপর তার নদীতে ভেঙে যাবার অশ্রুসজল দৃশ্যের বর্ণনা শুনতে না শুনতেই কানে এলো বৃদ্ধার কন্ঠ-‘নদী ভাঙনে মড়ে গেলাম বাবা’। ৭০ বছরের এই বৃদ্ধ ৮ বার নদী ভাঙনের বসতবাড়ি হারিয়েছেন। সবশেষে আবাস ঠাই করেছেন বিনানই গ্রামে। এখানেও নদী ভাঙনের তান্ডবে তিনি দিশেহারা। অশ্রু সজল কন্ঠে বললেন, বাবা ঘরবাড়ি রক্ষা করব, নাকি নাতিপুতি সামলাব, নাকি রান্নাবান্না না করে না খেয়ে মড়ব। তার এ কথার জবাব দিবে কে ?
জানালেন মহান আল্লাহ্ কবে যে আমাদের রক্ষা করবেন তিনিই ভালো জানেন। একই সুরে কথা বললেন রাবিয়া খাতুন। এরপর চরসলিমাবাদ ও চরনাকালিয়ার অবস্থান নিয়ে পেলাম আরও দুঃখের জীবন কাহিনি। এ গ্রামের আজহার মোল্লার ছেলে পঞ্চাশ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল করিম বলেন, গত নদী ভাঙ্গনে তার প্রায় ৬-৭ লাখ টাকার সম্পদ নদী গর্ভে চলে গেছে। এখন সে পথে বসেছে। তিনি বলেন আমরা সাহায্য চাইনা, চাই নদী ভাঙনের স্থায়ী সমাধান। আল ইমরান মনু, আ. রাজ্জাক ও বেলাল তাদের আক্ষেপ নদী ভাঙনের কবলে পড়ে যারা পথের ফকির তারা কোনো অনুদান কিংবা নদী ভাঙন কবলিত এলাকার তালিকার মধ্যে পড়ে না। মাঝে মাঝে কিছু চাল-ডাল পেলেও বড় কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক সচেতন মানুষ জানান, একে তো নদী ভাঙনে দিশেহারা আমরা, তার মধ্যে মরার উপর খাড়ার ঘা-এর মত বালুদস্যুরা সমান তালে তুলছেন বালু নদী থেকে, এসব দেখার বা বলার কেউ নেই। ফলে অব্যহতভাবে বালু উত্তোলন করায় প্রচন্ড ভাঙনের মুখে পড়েছে নদীপারের মানুষ।
চৌহালীর নদী ভাঙনে রাস্তাঘাট, হাটাবাজার, ঈদগাহ মাঠ, মাদ্রাসা, স্কুল কলেজসহ অন্যন্য প্রতিষ্ঠান এমনকি এনায়েতপুরে অবস্থিত ৫০০ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত খাজা ইউনুস আলী হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় নদী ভাঙনের হুমকির মুখে পরেছে। সেই সঙ্গে হাজার হাজার বিঘা জমি ও ফসলও যমুনা গ্রাস করেছে।
নদী ভাঙনে বরাদ্দ কিন্তু কম আসেনি তবে তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। নদী তীর রক্ষা সংরক্ষণ প্রকল্প, ব্লক ডাম্পিং, জিও ব্যাগ ডাম্পিং সহ বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা কিছু ধোপে টিকেনি। তাই নদী ভাঙন কবলিত মানুষেরা ভরসা পাচ্ছে না। কখন নদী ভাঙে, আর কখন পাততারি গোটাতে হয় এর চিন্তায় তারা অস্থির। তাদের চাই স্থায়ী সমাধান। শুস্ক মৌসুমে এমন নদী ভাঙনে পাগল প্রায় ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ সময়মত পাউবো কর্মকর্তারা নদী ভাঙনে পদক্ষেপ গ্রহন করেন না। মানুষ মরে গেলে যেমন পুলিশ আসে, বাড়ি-ঘর পুরে গেলে যেমন ফায়ার ব্রিগেট আসে তেমনি নদী ভেঙে মানুষ সর্বসান্ত হয়ে যাবার পর আসে পাউবোর কর্মকর্তা। এটাই এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এ ব্যাপারে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান ইতিমধ্যে ৪৬ কোটি ৮৯ লাথ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে কাজটি বাস্তবায়ন করা হবে।






