উল্লাপাড়াসদরসিরাজগঞ্জ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন সিরাজগঞ্জে

সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, মেহেরপুর কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী ও টাঙ্গাইল। এক সময় চরমপন্থীদের অভয়ারণ্য ছিল এ ৭ জেলা এসব এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক একটি জনপদ ছিল আতঙ্কের নাম। প্রতিদিনই চাঁদাবাজি, গুম, খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটতো।

মার্কসবাদী ও মাওবাদী আদর্শের নামে ১৪টি চরমপন্থী সংগঠন সক্রিয় ছিল এই জনপদে। এর মধ্যে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এম এল (লাল পতাকা), পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি (এমবিআরএম) ও পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি (জনযুদ্ধ) অন্যতম। ১৯৬৮ সাল থেকে এসব সংগঠন বিস্তৃত হতে থাকে। তরুণ সমাজকে ভুল বুঝিয়ে দলে টানতে থাকে চরমপন্থীদের শীর্ষ নেতারা। আশি-নব্বইয়ের দশকে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে চরমপন্থী সংগঠনগুলো। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে প্রকাশ্যে সশস্ত্র মহড়া দিয়ে আলাদা রাজত্ব কায়েম করতে থাকে তারা। হত্যা করা হয় কয়েক হাজার মানুষকে। পরবর্তীতে আধিপত্য বিস্তার ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়ে বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হতে থাকে তারা। একে অপরকে হত্যা করতে থাকে। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।

এ অবস্থায় ১৯৯৮ সালে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের হাতে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন চরমপন্থীদলের শীর্ষ নেতাসহ শতাধিক সদস্য। এরপর ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল পাবনায় পুলিশের কাছে ৫৯৬ জন চরমপন্থী সদস্য আত্মসমর্পণ করেন।

র‌্যাব জানায়, প্রায় দুই দশক ধরে চরমপন্থীদের দমনে কাজ করছে র‌্যাব। বন্দুকযুদ্ধে শীর্ষ কয়েক নেতা নিহত হলেও থেমে থাকেনি তাদের কর্মকাণ্ড। ২০২০ সালে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদকে চরমপন্থীদের আগ্রাসন থেকে রক্ষায় তাদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। র‌্যাবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা বেশ কয়েকটি সক্রিয় দলের নেতা প্রায় তিন শতাধিক সদস্য ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণের সম্মতি জানায়।

এরই ধারাবাহিককতা আজ রোববার (২১ মে) ২ শতাধিক অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করবেন ৩২৩ জন চরমপন্থী। এর মধ্যে পাবনা ১৮০, সিরাজগঞ্জে ১১, টাঙ্গাইল ৭৪, রাজবাড়ী ৫৪, মেহেরপুর ২, কুষ্টিয়া ও বগুড়ায় ১ জন করে চরমপন্থী রয়েছেন।

সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় র‌্যাব-১২ সদর দপ্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন তারা।অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বেনজীর আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খান,পুলিশ মহা-পরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, র‌্যাবের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি এম খুরশীদ হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।

র‌্যাব আরও জানায়, ‘উদয়ের পথে নামে একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে চরমপন্থি পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে চরমপন্থী পরিবারের ৩০ জন নারী সদস্যকে স্বাবলম্বী করতে হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও মাছ চাষ, গরু বা মুরগির খামার, রিকশা, সেলাই মেশিন প্রদানের মাধ্যমে চরমপন্থী নেতা ও সদস্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হবে।

আত্মসমর্পণকারী চরমপন্থী দলের নেতা মোহাম্মদ সাধু ও রাজু আহমেদ (সিরাজগঞ্জের দায়িত্বে), রুজবেল (টাঙ্গাইল), মনির (রাজবাড়ী) এবং দুলালের (পাবনা) সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আদর্শের নামে এতদিন তারা ভুল পথে ছিলেন। এখন তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। দুর্বিসহ ফেরারি জীবন তাদের আর ভালো লাগে না। তাই অন্ধকারের পথ থেকে আলোর পথে ফিরতে চান।

চরমপন্থী দলের সদস্যদের দাবি, কোন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও সেখানে জড়ানো হয়। এমন হয়রানি থেকে পরিত্রাণ পেতে চান তারা। তাদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে সেগুলো থেকে যেন তারা মুক্তি পান।

মোহাম্মদ সাধু বলেন, র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ ও অস্ত্র জমাদানের উদ্যোগে আমরা রাজি হয়েছি। পথভ্রষ্ট হয়ে এতদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকেছি। এখন আমরা সামাজিক স্বীকৃতি চাই। আমাদের পুনর্বাসিত করতে আশ্বস্ত করা হয়েছে। শ্রমিকের কাজ করে ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে চাই।

র‌্যাব-১২ অধিনায়ক অ্যাডিশনাল ডিআইজি মারুফ হোসেন বলেন, পূর্ব বাংলা সর্বহারা এবং পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এমএল (লাল পতাকা) তারা বিভিন্ন সোর্সে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা যে ভুল পথে ছিল সেখান থেকে মূল ধারায় ফিরে আসতে চায়। দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে চায়। প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনায় ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতায় র‌্যাবের উদ্যোগ আগামী রোববার (২১ মে) তিন শতাধিক চরমপন্থী সদস্য আত্মসমর্পণ করবে এবং ২ শতাধিক অস্ত্র জমা দেবে। এর ফলে ওই অঞ্চলে আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুবিধা হবে।

তিনি বলেন, খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ ছাড়া ছোটখাট অপরাধগুলো সাধারণ ক্ষমার আওতায় আসবে এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মামলাগুলো নিস্পত্তি হবে। প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন তাদের যাতে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা হয় এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে সুশিক্ষায় পেয়ে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে সেদিকে বিবেচনা রেখে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করি। অনেকদিন ধরে তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল ও তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। তাদের আস্থায় আনার জন্য প্রথমে আমরা তাদের পরিবারকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মদক্ষ করে তুলেছি। তাদের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা হবে। ৩০টি চরমপন্থী পরিবারকে এভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যারাই আত্মসমর্পণ করবে সবাইকে সরকারের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের আওতায় এনে কর্মদক্ষ করে গড়ে তোলা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button