
শাফি-উল-কাফি সুমন
নারী মাত্রই একজন মানুষ, এক অনন্য সত্তা। তার ব্যক্তি-অধিকার, আত্মসম্মান, এবং সামাজিক অবস্থান সবারই সমান হওয়া উচিত। কিন্তু সমাজের বিভিন্ন স্তরে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নানা কারণে ভিন্ন হয়ে থাকে। পরিবার, সমাজ, ধর্ম, এবং রাষ্ট্র নারীর অবস্থানকে কিভাবে দেখে এবং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কি পরিবর্তন প্রয়োজন, সেই বিষয়ে এক গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন।
সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি:
আমাদের সমাজে নারীদের সাধারণত দুটি প্রধান ভূমিকায় দেখা হয়-একজন মা, স্ত্রী, বা কন্যা হিসেবে এবং একজন পরনারী হিসেবে। পরিবারের ভেতরে নারী সম্মানিত ও রক্ষিত, কিন্তু বাইরে তিনি কি শুধুই একজন নারী, নাকি ‘পরনারী’? এ প্রশ্নটি সমাজের দ্বৈত মানসিকতার প্রতিফলন। পুরুষ যদি বহির্জগতে স্বাভাবিকভাবে বিচরণ করতে পারে, তবে নারীর ক্ষেত্রেও কি একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়? যদি নারী তার নিজস্ব পরিচয়ে সমাজে স্বাধীনভাবে চলাচল করেন, তবে তিনি কেন অন্যের কুদৃষ্টি বা অন্যায় আচরণের শিকার হন?
নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। সৌন্দর্য উপভোগ করা মানবপ্রকৃতির অংশ হলেও, এটি অন্যকে লাঞ্ছিত করার অধিকার দেয় না। সমাজে পুরুষদের ক্ষেত্রে যেমন ব্যক্তিস্বাধীনতা স্বীকৃত, নারীর ক্ষেত্রেও তেমনই হওয়া উচিত।
নারীর প্রতি সংসারের গুরুত্ব:
পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু নারী। মা, স্ত্রী, কন্যা ও বোন হিসেবে তিনি সংসারকে চালিত করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, নারীর এই অবদান অনেক সময় স্বীকৃত হয় না। নারীর শ্রমকে অধিকাংশ সময় আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান হিসেবে ধরা হয় না, যদিও তিনি সংসার পরিচালনা, সন্তান লালন-পালন, এবং পরিবারের অন্যান্য কাজের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
নারীর প্রতি সংসারের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত? সংসারে নারীর ভূমিকা শুধু দায়িত্ব পালন নয়, বরং তা পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। কেবলমাত্র পুরুষের জন্য নয়, নারীরও সমান অধিকার থাকা উচিত পরিবারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে।
নারীর অধিকার:
নারীর মৌলিক অধিকার বলতে বোঝায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার এবং স্বনির্ভরতার অধিকার। যদিও আইনগতভাবে নারীদের এসব অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতা এসব অধিকার বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
ক্স শিক্ষা: শিক্ষাই হলো নারীর ক্ষমতায়নের মূল চাবিকাঠি। শিক্ষিত নারী শুধু নিজের জন্য নয়, পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও কল্যাণ বয়ে আনে।
ক্স নিরাপত্তা: নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইনি কাঠামো যথেষ্ট নয়, বরং সমাজের মানসিকতা পরিবর্তন জরুরি।
ক্স অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা: অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নারী সংসারে এবং সমাজে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারেন। নারী উদ্যোক্তা, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা সমাজের দায়িত্ব।
কেয়ার ও শেয়ার:
একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য কেয়ার (যত্ন) এবং শেয়ার (ভাগাভাগি) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসারে নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ থাকা উচিত। নারীর কাজ শুধুমাত্র ঘরের কাজ আর পুরুষের কাজ বাহিরের কাজ-এই বিভাজন ধীরে ধীরে বদলানো দরকার। পুরুষ যদি ঘরের কাজে অংশ নেয়, তাহলে নারীর ওপর চাপ কমে এবং তিনি মানসিকভাবে ভালো থাকেন।
একটি পরিবারে নারী-পুরুষ উভয়ের যত্ন ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নারীর প্রতি যত্নশীল দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে সংসার সুখী হয় এবং পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
ধর্মের নির্দেশনা:
কোনো ধর্মই নারীকে অবমাননা করার শিক্ষা দেয় না। ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, হিন্দুধর্মসহ প্রতিটি ধর্মে নারীকে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে দেখার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলাম ধর্মে নারীর পর্দার বিধান থাকলেও, পুরুষেরও নিজের দৃষ্টি সংযত রাখার আদেশ রয়েছে। “বল, ঈমানদার পুরুষদের বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র।” (সূরা আন-নূর: ৩০)।
খ্রিস্টধর্মেও বলা হয়েছে, “তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীকে লালসার চোখে দেখো না।” (যাত্রাপুস্তক ২০:১৭)। হিন্দুধর্মে ‘নারীকে দেবী’ হিসেবে দেখা হয় এবং তাকে সম্মানের সাথে দেখার আদেশ দেওয়া হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, কেন সমাজে নারীকে একদিকে পূজা করা হয় আবার অন্যদিকে তাকে পরনারী হিসেবে দেখার প্রবণতা থাকে?
রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি:
রাষ্ট্র নারীদের সুরক্ষা দিতে আইনি কাঠামো গড়ে তুলেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ধর্ষণ আইন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন প্রভৃতি নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তার সুরক্ষা দিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এই আইনগুলোর বাস্তবায়ন কেমন? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়া, সামাজিক ভয়, অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতির কারণে নারীরা ন্যায়বিচার পান না।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ যেমন নারী উন্নয়ন নীতি, কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা, ও বাল্যবিবাহ রোধে কার্যক্রম চালু থাকলেও, তা কতটুকু কার্যকর হচ্ছে? আইন কার্যকর করতে হলে প্রশাসন ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব থাকা দরকার। পাশাপাশি, জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধিও অপরিহার্য।
উপসংহার:
নারী শুধুই একজন নারী, পরনারী নয়। তাকে পরিবার ও সমাজ উভয়ক্ষেত্রেই সমানভাবে মর্যাদা দিতে হবে। ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাই নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করলেই নয়, আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করলেই সমাজে সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে। আমাদের উচিত নারীর প্রতি সম্মান দেখানো এবং তার অধিকার নিশ্চিত করা, যাতে সে স্বাধীনভাবে চলতে পারে এবং সামাজিক কাঠামোর ভেতরেও সে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে।
নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা সময়ের দাবি। নারীর অবস্থান কেবল পরিবারের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার নিজস্ব স্বপ্ন, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। তাই সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র-সবাই মিলে নারীকে প্রকৃত সম্মান ও স্বাধীনতা প্রদান করলেই আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ গড়তে পারবো।
শাফি-উল-কাফি সুমন উন্নয়ন কর্মী






