
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বহুলী ইউনিয়নের চন্দ্রকোনা গ্রামে মালচিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে শসা চাষে অনন্য সাফল্য অর্জন করেছেন নারী উদ্যোক্তা মিনা খাতুন (৫৭)। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এনডিপি) এর বাস্তবায়নে এবং পিকেএসএফ-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত বিশেষ কর্মসূচি উন্নয়ন (কৃষি) প্রকল্প এই সফলতার পথ তৈরি করেছে। এ উদ্যোগ স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
উপজেলায় পূর্বেও মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদের চেষ্টা হলেও সঠিক নির্দেশনা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়নি। কিন্তু এনডিপির প্রশিক্ষণ, উপকরণ সহায়তা ও নিবিড় তদারকির ফলে এবার মিলেছে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য।
এনডিপির উদ্যোগে মিনা খাতুনকে মালচিং পেপার, জৈব সার, জৈব বালাইনাশক, হলুদ ও নীল স্টিকি কার্ডসহ আধুনিক কৃষি উপকরণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। পাশাপাশি তাকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ পদ্ধতির উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা তার কৃষি জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
মিনা খাতুনের ছেলে জাহিদ শেখ দরিদ্র পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর আর তা চালিয়ে যেতে পারেননি। তবে নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে পেছনে ফেলে তিনি এখন তার ছোট বোনকে উচ্চশিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখেন। দীর্ঘদিন ধরে বর্গা জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করলেও তিনি তেমন লাভবান হতে পারেননি।
একসময় সালুয়াভিটা সবজি বাজারে এনডিপির কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তখন তিনি জানান, প্রচলিত পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে লাভ করতে পারছেন না। আলোচনার এক পর্যায়ে জানা যায়, মালচিং পেপার, হলুদ-নীল স্টিকি কার্ড কিংবা ফেরোমন ফাঁদ—এসব আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সাথে তার কোনো পরিচয়ই ছিল না। পরে তাকে সরেজমিনে মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদ দেখানো হয় এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
এনডিপির মাইক্রোক্রেডিট কর্মসূচির সদস্য হওয়ায় জাহিদ শেখ ও তার পরিবার প্রকল্পের আওতায় প্রদর্শনীর জন্য অনুদান পান। এরপর ২৬ শতক জমি লিজ নিয়ে মালচিং পেপার ব্যবহার করে শসা চাষ শুরু করেন মিনা খাতুন।
প্রথম বছরেই আসে অভাবনীয় সাফল্য। মাত্র তিন মাসে ২৬ শতক জমিতে শসা চাষে মোট খরচ হয় প্রায় ৩৮ হাজার টাকা। আর বিক্রি হয় প্রায় ৯৭ হাজার টাকার শসা, যেখানে নিট লাভ দাঁড়ায় প্রায় ৫৯ হাজার টাকা। আগাম চাষের কারণে বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় এই সাফল্য আরও দৃশ্যমান হয়।

শুধু শসা নয়, একই জমিতে পূর্বের মালচিং পেপার ব্যবহার করে বর্তমানে ধুন্দল ও বরবটি চাষ করছেন তারা। এতে খরচ আরও কমে আসবে বলে আশা করছেন জাহিদ শেখ।
মিনা খাতুন বলেন, “এনডিপির সহযোগিতায় নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমি ভালো ফলন ও লাভ পেয়েছি। এই লাভের টাকা দিয়ে ভবিষ্যতে আরও জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ বাড়াতে চাই।”
এই প্রদর্শনী প্লট দেখে ইতোমধ্যে আশপাশের অনেক কৃষক মালচিং প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। জাহিদ শেখও এখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, মালচিং পদ্ধতি ছাড়া সবজি চাষে আর ফিরবেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক দিকনির্দেশনা, আধুনিক প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা পেলে গ্রামীণ কৃষিতে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। আর এই ক্ষেত্রেই ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এনডিপি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে, যা শুধু একজন কৃষকের সাফল্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।






